সমস্যা যখন মনের অসুখ

‘মানুষের মন আছে তাই মনও অসুস্থ হতে পারে’ একসময় এটা মানুষের ধারণার বাইরে ছিল। মানুষ এখন মনের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছে। মন যেকোনো কারণে অসুস্থ হতে পারে এটা এখন মানুষ স্বীকার করছে। এর পুরোটাই সম্ভব হয়েছে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মানসিক রোগ চিকিৎসার উত্তরোত্তর উন্নতির জন্য।

অন্যান্য শারীরিক অসুস্থতার মতোই মানসিক রোগ নির্ণয় করা হয় উপসর্গ অনুযায়ী। তবে মানসিক রোগের উপসর্গসমূহ সমাজ, কাল, পাত্র ও পরিবেশ অনুযায়ী একেক দেশে, একেক সময়ে একেকরকম হয়। শিক্ষার সাথেও এর সম্পর্ক রয়েছে। শিক্ষিত সমাজে এ রোগের উপসর্গগুলো হয় স্থুল। এ রোগ নির্ণয় পুরোটাই (শতকরা ৮০ ভাগ) নির্ভর করে রোগীর আচরণগত অসামঞ্জস্যতার ওপর।
সমস্যা যখন মনের অসুখ
অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণেও এ রোগ বেড়ে যেতে পারে যেমন- শেয়ার মার্কেটে ধস এবং বিশ্ব মন্দার পর কিছু রোগী আসেন বিষণ্ণতা উপসর্গ নিয়ে। এখানে বিষণ্ণতা অর্থনৈতিক সমস্যার সাথে পুরোপুরি সম্পর্কিত। তাছাড়া কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতালোখী হয়তো নিজেকে উপজেলা চেয়ারম্যান ভাবতে ভাবতে প্রকাশ্য জোর দাবি নিয়ে বলতে শুরু করবেন তিনি উপজেলা চেয়ারম্যান।
এছাড়া স্থান, কাল ও পাত্রভেদে কিছু উপসর্গের মিল সচরাচর দেখা যায় যেমন- অশান্তি লাগা, কাজে অনীহা, বুক ধড়ফড় করা, মাথাব্যথা, বুকে চাপবোধ করা, অকস্মাৎ খিঁচুনি, কিছু মনে করতে না পারা, অল্পতেই বিরক্ত হওয়া, ঘুম না হওয়া, খাদ্যে অরুচি, অতিরিক্ত কথা বলা, বিড়বিড় করা, ছটফট করা, অস্থিরচিত্ত ইত্যাদি উপসর্গ। এসব উপসর্গ মোটামুটিভাবে সারাদেশে একইরকম।
আবার গায়েবি আওয়াজ শোনা, মনে মনে কথা বলা, যৌন ইচ্ছা কমে যাওয়া, অতিরিক্ত যৌনইচ্ছা ইত্যাদি উপসর্গও বিভিন্ন মানসিক রোগে লক্ষ্য করা যায়। উপসর্গ অনুযায়ী মানসিক রোগ দু’প্রকার হতে পারে। যথা একটি মৃদু মানসিক রোগ অপরটি হলো জটিল মানসিক রোগ। মৃদু মানসিক রোগ আবার কয়েকরকম হতে পারে যেমন-

অ্যাংজাইটি নিউরোসিস

দুশ্চিন্তাবোধ, হাত-পা কাঁপা, মুখ ও গলা শুকিয়ে যাওয়া, বুকে চাপ লাগা, ঘনঘন প্রস্রাব হওয়া, মাথাব্যথা, হাত-পা কামড়ানো, ঘুম না হওয়া, ছটফট করা ইত্যাদি উপসর্গের মাধ্যমে এই রোগ প্রকাশ পেতে পারে।

অহেতুক ভয় বা ফোবিয়া

অযথা কোনো বিষয়ে ভয়, মৃত্যুর ভয়, পোকামাকড়ের ভয়, লোকসমাজে আসার ভয়, বক্তৃতা দিতে ভয় পাওয়া ইত্যাদি উপসর্গের মাধ্যমে এই রোগ প্রকাশ পায়।

অবসেশন

একই কাজ বারবার করা, একই চিন্তা বারবার করা, অনবরত হাত কিংবা পা ধোঁয়া, অতিরিক্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা, সন্দেহবাতিকতা এবং মনের বিরুদ্ধে কথা বলা এই রোগের উপসর্গ। তাছাড়া সাইকোটিক রোগ আবার বিভিন্ন প্রকার হতে পারে। যেমন-

হিস্টিরিয়া বা মূর্ছারোগ

অর্গানিক কোনো সমস্যা ছাড়াই হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, খিঁচুনি, দাঁতে দাঁতে লাগা, এলোমেলো কথা বলা, হঠাৎ চোখে না দেখা, হাত-পা অবশ হয়ে যাওয়া ইত্যাদি উপসর্গের মাধ্যমে এই রোগ প্রকাশ পায়।

সিজোফ্রেনিয়া

কানে গায়েবি আওয়াজ শোনা, একাএকা কথা বলা, মনের কথা বাইরে প্রকাশ হয়ে যাওয়া, ঘরকুণো হয়ে থাকা, কাজ না করে অগোছালো, এলোমেলো ঘুরে বেড়ানো ইত্যাদি উপসর্গ সিজোফ্রেনিয়া রোগে প্রকাশ পেতে পারে।

ম্যানিয়া

ঘনঘন কথা বলা, অতিরিক্ত কথা বলা, অহেতুক আশ্বাস ও অহেতুক পরামর্শ দেয়া, একসাথে অনেক কাজ হাতে নেয়া এসব হলো ম্যানিয়া রোগের উপসর্গ।

ডিপ্রেশন

অশান্তি লাগা, কোনো কাজে মন না বসা, অহেতুক কান্নাকাটি করা, আত্মহত্যা করার প্রবণতা কিংবা আত্মহত্যা করে বসা, কোনো কারণ ছাড়াই শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যথা অনুভব করা, ঘুম না হওয়া, আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া ইত্যাদি উপসর্গের মাধ্যমে এই রোগ প্রকাশ পেতে পারে।
এসব উপসর্গের বাইরেও আমাদের আর্থসামাজিক শিক্ষাব্যবস্থায় কিছু কিছু নতুন উপসর্গ উদ্ভব হতে পারে। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষা অনুযায়ী, শতকরা একভাগ অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রায় ১৮ লাখ লোক সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত। তিন থেকে চারভাগ লোক ডিপ্রেশনে আক্রান্ত। এছাড়া শতকরা ৩০ ভাগ লোক কোনো না কোনোভাবে বিভিন্ন নিউরোটিক ডিসওর্ডারে ভুগছে। তবে এরোগ যেহেতু বাস্তবতার সাথে ভারসাম্যহীনতা ও শরীরের কিছু হরমোন এবং নিউরোটিক পরিবর্তনের ফলে হয়ে থাকে সেহেতু সঠিক সময়ে অত্যাধুনিক চিকিৎসায় এই রোগ পুরোপুরি ভালো হয়ে যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *