শিশুদের সাথে আপনার আচরণ কেমন হওয়া উচিত?

দীর্ঘসময় পার করা এই মানব সভ্যতায় অনেক প্রশ্নের সঠিক উত্তর খুঁজে পেলেও এখনও নিজ সন্তানের লালন-পালন নিয়ে সংশয়ে ভোগেন বাবা-মা। বাংলাদেশে একসময় কঠোর শাসনে সন্তান লালন-পালনের নিয়ম প্রচলিত থাকলেও ধীরে ধীরে সেই ধারণা থেকে বের হয়ে আসছেন আধুনিক বাবা-মা। কিন্তু নতুন লালন-পালনের এই নিয়মগুলো নিয়ে রয়ে গেছে অনেক সংশয়।

ইদানীং পরিবারগুলো ছোট হয়ে আসায় শিশুর দেখাশোনার মূল দায়িত্ব একাই পালন করে যান মা। আর বাবা-মা উভয় কর্মজীবী হলে এর ফল আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। সারাদিন শেষে বাবা-মাকে পেয়ে শিশুরা বাড়তি উচ্ছ্বাস দেখানোর পাশাপাশি কখনও কখনও খিটখিটে মেজাজের হয়ে ওঠে। বিষয়টিকে সামলাতে মাঝে মাধ্যে মা-বাবা বকা দেন শিশুদের। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের শিশু বিষয়ক সংস্থা আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়েট্রিকস জানায়, এটি করলে শিশু আরও বেশি খিটখিটে মেজাজের হয়ে যেতে পারে। সেই সাথে তাদের ব্যক্তি ও মানসিক গঠনে বড় ধরণের পরিবর্তন নিয়ে আসে বাবা-মায়ের এমন আচরণ।

গবেষকরা জানান, মা-বাবা শিশুর জন্য শেষ আশ্রয়স্থল। আর সেখান থেকে এ ধরণের আচরণ পেলে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। কোন কাজ করার জন্য শিশুকে বকা দিলে সেই কাজ করার প্রতি শিশুর আগ্রহ আরও বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়।

তাহলে বকা না দিয়ে কীভাবে আপনার শিশুর আচরণকে পরিবর্তন করবেন?

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে পাঁচটি পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে। সেখানে প্রথমে বলা হয়েছে শিশুকে রক্ষা করতে বকা দেয়া এবং শিশুর ওপর রাগ দেখিয়ে বকা দেওয়ার মধ্যে পার্থক্যটা বাবা-মাকে আগে বুঝতে হবে। শিশুর ওপর কখনও রাগ প্রকাশ করা যাবে না। সেটা আপনার যতিই কষ্ট হোক। সেই সাথে শিশুকে বকা দেয়ার পর বোঝানো কেন বকা দেয়া হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, যখন আপনি নিজের রাগ সামলাতে পারবেন না তখন নিজের কপাল চেপে ধরুণ। সমাধানটি আপাতত দৃষ্টিতে হাস্যকর মনে হলেও এটি পরীক্ষিত একটি বিষয়। কেননা আমাদের ‘লিম্বিক সিস্টেম’ থেকে রাগের জন্ম। আর সে কারণেই কপাল চেপে ধরলে আপনার রাগ কিছুটা হলেও প্রশমিত হবে। আপনার রাগ কিছুটা কমলে ভেবে দেখুন, আসলে আপনি কী করতে চান? তারপর সেই সিদ্ধান্ত অনুসারে কাজ করুন।
তৃতীয়ত, ‘মুরগীর মতো’ নিজেকে আটকে রাখুন। এটি আসলে নিজের রাগকে সামলানোর সবচাইতে সফল পদ্ধতি। কার্লা নামবার্গ জানান আপনি রেগে গেলে তখন ভিন্ন কিছু করুন। যে বিষয় নিয়ে আপনি রেগে আছেন তা মন থেকে ঝেড়ে ফেলে আপনি চুপ করে বসে পড়ুন। বেশি রাগ হলে হাত উপরে তুলে আত্মসমর্পণের মতো করে ধরে রাখুন। বড় করে নিঃশ্বাস নিন অথবা অদ্ভুত ও হাস্যকর কিছু করুন। এতে করে আপনার রাগত কমবেই সাথে সাথে হয়তো আপনার শিশুও তার বিরক্তিকর কাজ বন্ধ করে আপনার দিতে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকবে।
চতুর্থ পরামর্শ হলো, শান্ত গলায় কঠিন কথাটি বলুন। আপনার শিশুর কোনো আচরণ পছন্দ না হলে বা তা ঠিক না হলে বাবা-মায়ের কর্তব্য তাকে সাবধান করা। কিন্তু সেটি চিৎকার করে না বলে শীতল গলায় বলুন। এ প্রসঙ্গে উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, প্লেন খারাপ আবহাওয়ার মধ্য দিয়ে গেলে পাইলটকে বিষয়টি ঘোষণা করতে হয়। কিন্তু সে খুব উচ্ছ্বাস নিয়ে ঘোষণা করলে যাত্রীরা বিভ্রান্ত হয়ে যাবে। আবার চিৎকার করে বললে সবাই ভয় পাবে। তাই শীতল কণ্ঠে বুঝিয়ে দেয়া বিষয়টি পছন্দ করছেন না আপনি এবং এর জন্য ভবিষ্যতে শাস্তি পেতে হবে।
সর্বশেষ পরামর্শ হিসেবে বলা হয়েছে, বারবার আপনার সন্তানকে বলে যাওয়া এবং শিখিয়ে যাওয়া। শিশুকে কিছু বললেই সে শিখে নেবে এমন নয়। তাই আপনাকে বারবার বলে যেতে হবে, চেষ্টা করে যেতে হবে। আর বারবার চেষ্টা করার পরও শিশু আপনার কথা না শোনার অর্থ এই নয় যে মা-বাবা হিসেবে আপনি ব্যর্থ বরং ভিন্নভাবে নতুন করে আপনাকে চেষ্টা করে যেতে হবে। ধৈর্য হারাবেন না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *